ফেসবুক পেজে বিক্রি করতে করতে অনেকেই একসময় ভাবেন, ই কমার্স ওয়েবসাইট কিভাবে তৈরি করব?
ফেসবুক পেজে বিক্রি করতে করতে অনেকেই একসময় ভাবেন, ই কমার্স ওয়েবসাইট কিভাবে তৈরি করব? নিজের ওয়েবসাইট থাকলে গ্রাহক যেকোনো সময় প্রোডাক্ট দেখে অর্ডার দিতে পারেন, ইনবক্সে একই প্রশ্নের উত্তর বারবার দিতে হয় না, আর আপনার ব্র্যান্ড আরও বিশ্বাসযোগ্য দেখায়। ভালো খবর হলো, এখন ই-কমার্স ওয়েবসাইট বানাতে প্রোগ্রামার হওয়ার দরকার নেই। এই গাইডে আমরা একদম শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সহজ ভাষায় দেখাব কীভাবে নিজের অনলাইন স্টোর তৈরি করবেন।
ই কমার্স ওয়েবসাইট তৈরির দুটি পথ
পথ ১: কোড লিখে বা ডেভেলপার দিয়ে বানানো
এই পদ্ধতিতে একজন ডেভেলপার বা এজেন্সি আপনার জন্য কাস্টম সাইট বানায়। পূর্ণ স্বাধীনতা পাওয়া যায়, কিন্তু সময় ও খরচ বেশি লাগে। এরপর হোস্টিং, সিকিউরিটি, আপডেট এবং বাগ ঠিক করার দায়িত্বও আপনার উপর থাকে।
পথ ২: রেডিমেড ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা
Multipurc-এর মতো প্ল্যাটফর্মে অ্যাকাউন্ট খুলে থিম বেছে নিলেই স্টোরের কাঠামো তৈরি হয়ে যায়। আপনি শুধু প্রোডাক্ট, ছবি, দাম ও সেটিংস বসাবেন। নতুন উদ্যোক্তাদের জন্য এটাই সবচেয়ে সহজ ও দ্রুত পথ। এই গাইডটি মূলত এই পথ ধরে সাজানো।
ধাপ ১: ব্যবসার পরিকল্পনা ঠিক করুন
ওয়েবসাইট বানানোর আগে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর ঠিক করে নিন:
- কী বিক্রি করবেন? পোশাক, গ্রোসারি, ইলেকট্রনিক্স, কসমেটিকস নাকি হাতের কাজ?
- আপনার গ্রাহক কারা? বয়স, এলাকা এবং তারা কোন ডিভাইসে কেনাকাটা করেন।
- কোথায় ডেলিভারি দেবেন? শুধু ঢাকায় নাকি সারা দেশে।
- কীভাবে পেমেন্ট নেবেন? ক্যাশ অন ডেলিভারি, বিকাশ, নাকি কার্ড।
এই উত্তরগুলো থিম বাছাই, ডেলিভারি চার্জ সেটআপ এবং পেমেন্ট অপশন ঠিক করতে সাহায্য করবে।
ধাপ ২: ব্র্যান্ডের নাম ও ডোমেইন বেছে নিন
ছোট, সহজে উচ্চারণযোগ্য এবং মনে রাখার মতো একটি নাম বেছে নিন। নামটি ফেসবুক পেজ, ইনস্টাগ্রাম ও ডোমেইনে একই রাখার চেষ্টা করুন। নাম বাছাইয়ের জন্য আমাদের অনলাইন শপের ইউনিক নাম নিয়ে লেখাটিও কাজে লাগবে। নিজের ডোমেইন (যেমন yourbrand.com) থাকলে গ্রাহকের কাছে স্টোরটি আরও পেশাদার মনে হয়।
ধাপ ৩: প্ল্যাটফর্মে অ্যাকাউন্ট খুলুন
Multipurc-এ রেজিস্টার করলে আপনার জন্য একটি আলাদা স্টোর তৈরি হয়, যার নিজস্ব অ্যাডমিন প্যানেল থাকে। এখান থেকেই প্রোডাক্ট, অর্ডার, গ্রাহক, পেমেন্ট এবং ডেলিভারি সব নিয়ন্ত্রণ করবেন।
ধাপ ৪: থিম বেছে নিন ও কাস্টমাইজ করুন
থিম হলো আপনার স্টোরের চেহারা। পোশাকের দোকানের জন্য ফ্যাশন থিম, গ্রোসারির জন্য গ্রোসারি থিম, ইলেকট্রনিক্সের জন্য আলাদা থিম বেছে নিলে গ্রাহকের কাছে স্টোরটি স্বাভাবিক লাগে। Multipurc-এর থিম গ্যালারি-তে সব থিম দেখতে পারবেন। একটি ফ্যাশন স্টোর দেখতে কেমন হয় তা বুঝতে আমাদের Fashion House ডেমো স্টোর দেখুন।
থিম বেছে নেওয়ার পর যা করবেন:
- লোগো ও ফেভিকন আপলোড করুন
- ব্র্যান্ডের রং ঠিক করুন
- হোমপেজের ব্যানারে পরিষ্কার হেডলাইন ও অফার লিখুন
- ফুটারে ঠিকানা, ফোন নম্বর ও ইমেইল দিন
ধাপ ৫: ক্যাটাগরি ও প্রোডাক্ট যোগ করুন
প্রথমে ক্যাটাগরি তৈরি করুন, যেমন "পুরুষের পোশাক", "মেয়েদের পোশাক", "এক্সেসরিজ"। তারপর প্রতিটি প্রোডাক্টের জন্য দিন:
- পরিষ্কার নাম (যেমন "সুতি পাঞ্জাবি – সাদা")
- একাধিক মানসম্পন্ন ছবি
- বিস্তারিত বর্ণনা: কাপড়, মাপ, যত্নের নিয়ম
- দাম, ছাড়ের দাম এবং স্টক সংখ্যা
- সাইজ বা রঙের ভ্যারিয়েন্ট
ভালো বর্ণনা শুধু গ্রাহককে সাহায্য করে না, গুগলেও আপনার প্রোডাক্ট খুঁজে পেতে সাহায্য করে।
ধাপ ৬: পেমেন্ট অপশন চালু করুন
বাংলাদেশে বেশিরভাগ গ্রাহক এখনও ক্যাশ অন ডেলিভারি পছন্দ করেন, আবার অনেকে বিকাশ বা কার্ডে আগে পেমেন্ট করতে চান। তাই দুই ধরনের অপশনই রাখুন। Multipurc-এ প্লাগইন পেজ থেকে SSLCommerz-এর মাধ্যমে অনলাইন পেমেন্ট এবং ক্যাশ অন ডেলিভারি চালু করা যায়। বিস্তারিত জানতে পড়ুন আমাদের বিকাশ পেমেন্ট গেটওয়ে গাইড।
ধাপ ৭: ডেলিভারি ও কুরিয়ার সেটআপ
ঢাকার ভেতরে ও বাইরে আলাদা ডেলিভারি চার্জ ঠিক করুন। Pathao বা Steadfast-এর মতো কুরিয়ার ইন্টিগ্রেশন চালু করলে অর্ডার থেকে সরাসরি পার্সেল বুক করা যায় এবং ট্র্যাকিং সহজ হয়। এতে হাতে হাতে তথ্য লেখার ভুলও কমে।
ধাপ ৮: জরুরি পেজগুলো তৈরি করুন
গ্রাহকের আস্থা অর্জনের জন্য এই পেজগুলো অবশ্যই রাখুন:
- About Us: আপনি কে এবং কেন এই ব্যবসা করছেন
- Contact: ফোন, ইমেইল, ঠিকানা
- Return ও Refund Policy: কোন অবস্থায় পণ্য ফেরত নেবেন
- Privacy Policy: গ্রাহকের তথ্য কীভাবে ব্যবহার করবেন
- Terms and Conditions
ধাপ ৯: SEO-এর প্রাথমিক কাজ
গুগল থেকে ফ্রি ভিজিটর পেতে প্রতিটি পেজের মেটা টাইটেল ও ডেসক্রিপশন লিখুন, ছবিতে alt টেক্সট দিন এবং প্রোডাক্টের নামে মানুষ যে শব্দে খোঁজে সেটা ব্যবহার করুন। নিয়মিত ব্লগ লিখলে আরও বেশি কিওয়ার্ডে র্যাঙ্ক করার সুযোগ তৈরি হয়। সাইট চালুর পর Google Search Console-এ সাইটম্যাপ জমা দিন।
ধাপ ১০: টেস্ট অর্ডার দিয়ে যাচাই করুন
লঞ্চের আগে নিজে মোবাইল ও কম্পিউটার থেকে একটি করে টেস্ট অর্ডার দিন। দেখুন প্রোডাক্ট কার্টে যাচ্ছে কিনা, চেকআউট ঠিক আছে কিনা, পেমেন্ট সম্পন্ন হচ্ছে কিনা এবং অর্ডার কনফার্মেশন আসছে কিনা। কোনো সমস্যা পেলে লঞ্চের আগেই ঠিক করুন।
ধাপ ১১: লঞ্চ ও প্রচার
সব ঠিক থাকলে স্টোর চালু করুন। ফেসবুক পেজ, ইনস্টাগ্রাম, হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ এবং পরিচিতদের মাঝে লিংক শেয়ার করুন। প্রথম কিছু গ্রাহককে বিশেষ কুপন দিতে পারেন, যাতে তারা রিভিউ দেন এবং অন্যদের জানান।
যে ভুলগুলো এড়িয়ে চলবেন
- ঝাপসা বা অন্যের কপি করা ছবি ব্যবহার করা
- দাম বা ডেলিভারি চার্জ লুকিয়ে রাখা
- মোবাইলে সাইট কেমন দেখায় তা না দেখা
- রিটার্ন পলিসি না রাখা
- অর্ডার আসার পর দেরিতে কনফার্ম করা
মোবাইল ব্যবহারকারীদের কথা আগে ভাবুন
বাংলাদেশে অনেক ক্রেতা মোবাইল ফোন থেকেই অনলাইনে কেনাকাটা করেন। তাই স্টোর সাজানোর সময় মোবাইলে কেমন দেখাচ্ছে তা বারবার পরীক্ষা করুন। বোতাম যেন বড় ও সহজে চাপা যায়, ছবি যেন দ্রুত লোড হয়, আর চেকআউটে যেন অপ্রয়োজনীয় ঘর না থাকে। ঠিকানা লেখার ঘরে এলাকা ও জেলা বেছে নেওয়ার সুবিধা থাকলে ভুল ঠিকানার কারণে ডেলিভারি সমস্যা কমে। প্রতিটি প্রোডাক্ট পেজে ডেলিভারি চার্জ ও সময় পরিষ্কারভাবে লিখে দিলে ক্রেতাকে বারবার প্রশ্ন করতে হয় না। মনে রাখবেন, সহজ ও দ্রুত কেনাকাটার অভিজ্ঞতাই ক্রেতাকে আবার আপনার স্টোরে ফিরিয়ে আনে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা (FAQ)
কোডিং না জেনে কি ই কমার্স ওয়েবসাইট তৈরি করা যায়?
হ্যাঁ। Multipurc-এর মতো প্ল্যাটফর্মে থিম, প্রোডাক্ট, পেমেন্ট ও ডেলিভারি সবকিছু ড্যাশবোর্ড থেকে সেটআপ করা যায়, কোড লিখতে হয় না।
ই কমার্স ওয়েবসাইট তৈরি করতে কত সময় লাগে?
রেডিমেড প্ল্যাটফর্মে মূল সেটআপ খুব অল্প সময়ে করা যায়। কত দ্রুত শেষ হবে তা নির্ভর করে আপনার প্রোডাক্টের সংখ্যা ও ছবি, বর্ণনা কতটা প্রস্তুত তার উপর।
নিজের ডোমেইন কি লাগবেই?
শুরুতে না হলেও চলে, তবে নিজের ডোমেইন থাকলে ব্র্যান্ড বেশি পেশাদার দেখায় এবং দীর্ঘমেয়াদে SEO-তে সুবিধা হয়।
অনলাইনে পেমেন্ট নেওয়া যাবে?
হ্যাঁ, Multipurc-এ SSLCommerz প্লাগইন চালু করে অনলাইন পেমেন্ট নেওয়া যায়, সাথে ক্যাশ অন ডেলিভারিও রাখা যায়।
ফেসবুক পেজ থাকলে কি ওয়েবসাইট দরকার?
ফেসবুক প্রচারের জন্য দারুণ, কিন্তু ওয়েবসাইটে অর্ডার ম্যানেজমেন্ট, পেমেন্ট ও ব্র্যান্ডের নিয়ন্ত্রণ আপনার হাতে থাকে। দুটো একসাথে ব্যবহার করাই ভালো।
শেষ কথা
ই কমার্স ওয়েবসাইট কিভাবে তৈরি করব, এই প্রশ্নের উত্তর এখন আগের চেয়ে অনেক সহজ। পরিকল্পনা, নাম, থিম, প্রোডাক্ট, পেমেন্ট, ডেলিভারি, পলিসি পেজ, SEO এবং টেস্ট, এই ধাপগুলো মেনে চললে আপনি নিজেই একটি পেশাদার অনলাইন স্টোর চালু করতে পারবেন। Multipurc দিয়ে আজই শুরু করুন, আর সাহায্য লাগলে [email protected]এ ঢাকায় আমাদের টিমকে লিখুন।